মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

১।হেমনগর রাজ বাড়ী




গোপালপুরের সেই জমিদার নেই
কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে ভাঙ্গা প্রাসাদ

আমাদের দেশে জন্ম হয়নি সম্রাট শাজাহান কিংবা ফেরাউনের মতো প্রভাবশালী রাজার। তাই গড়ে উঠেনি তাজমহল, পিরামিড অথবা ব্যাবিলনের মতো শুন্য উদ্যান। কিন্তু তারপর ও আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক অমর কীর্তি, পুরোনো আমলের জমিদার বাড়ী। যার সঠিক খবর হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা। এমনি একটি জমিদার বাড়ী রয়েছে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার হেমনগরে।
এখানে আজ আর জমিদার নেই। জমিদারের হাজার বেহারার পালকি সহ দাপটও নেই। কিন্তু  আজও ভেসে আছে জমিদারদের কত কথিত অখ্যাত কাহিনী। এমনি কাহিনীর জীবন্ত সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে হেমনগরের জমিদার বাড়ী। বহু কাহিনী বিজড়িত দালান গুলো পুরনো দিনের বি¯তৃত প্রায় ইতিহাসকে নতুন করে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রেখেছে।
গোপালপুর উপজেলা সদর হতে প্রায় ১৫ কি. মি. পশ্চিমে প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত ছায়া সুনিবিড় গ্রাম হেমনগর। উপজেলার একটি ইউনিয়ন ও ঐতিহাসিক স্থান। যেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীর কারুকাজ করা হেমবাবুর জমিদার বাড়ীর দ্বিতল ভবনটি আজও সেই পুরোনো ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উচু করে সগর্বে দম্ভ প্রকাশ করছে। বাড়ীর সামনে রয়েছে বিরাট মাঠ। মাঠ পেরিয়ে গেলেই দেখা যায় দ্বিতল বাড়ীর ছাদে দু’টি পরীর ভাস্কর্য রয়েছে। তাই লোকে একে পরীর দালানও বলে। একশ’ কক্ষ বিশিষ্ট এই বাড়ীটি প্রায় ত্রিশ একর জমির উপর তৈরি। সামনে দরবার ঘর, দু’পাশে সারি-সারি ঘর গুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে চতুর্ভুজাকার জমিদার প্রাসাদ। তিন ফুট প্রশস্ত দেয়ালে ঘেরা জমিদার বাড়ীর মাঠের সামনে এবং বাড়ীর পেছনে রয়েছে বেশ বড়ো বড়ো দু’টি পুকুর। শিক্ষা-সংস্কৃতি বিকাশে জমিদার পরিবারের ছিল ব্যাপক ভূমিকা। জমিদার প্রাসাদের পাশে ছিল চিড়িয়াখানা, নাটকের ঘর। তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি (আদ্য) পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল এটি।
হেমনগরের জমিদার হেরেম্ব চন্দ্র চৌধুরির পিতা কালিবাবু চৌধুরি ছিলেন ব্যবসায়ী। তিনি সূর্যাস্ত আইনের আওতায়  শিমুলিয়া পরগণার জমিদারি কিনে নেন। কালিবাবু চৌধুরির ছিল চার ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে হেরেশ্বর চন্দ্র চৌধুরি জমিদারি দেখা-শোনার দায়িত্ব পান। তিনি তদানিন্তন ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর  উপজেলার অন্তর্গত আমবাড়িয়া ষ্টেটে জমিদার বাড়ী বানান এবং জমিদারি পরিচালনা করেন। কিন্তু আমাড়িয়া থেকে যমুনার পূর্বপাড় এবং সেখান থেকে মধুপুর গড় পযর্ন্ত বিশাল এলাকার জমিদারি পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই তিনি গোপালপুর উপজেলার সুবর্ণখালী নাম গ্রামে দ্বিতীয় বাড়ী নির্মাণ করে জমিদারী প্রাসাদ বানান। নদী ভাঙ্গনে সুবর্ণখালি বিলীন হতে থাকলে তিনি শিমলা পাড়া গ্রামে ১৮৮০ সালের দিকে রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন এবং নিজ নামে এলাকার নামকরণ করেন হেমনগর। হেরেম্ব বাবুর ছোট ভাই প্রফুল্ল চন্দ্র চৌধুরি হাদিরার সৈয়দপুর গ্রামে আরো একটি বাড়ী বানানোর চিন্তা ভাবনা করে ছিলেন বলে সেখানেও একটি এলাকার নাম করণ করা হয়েছে প্রফুল্লনগর।
হেমবাবুর জমিদার প্রাসাদ প্রথম দিন যে ভাবে তৈরি হয়েছিল কালের গতিতে অনেক কিছুই ভেসে গেছে। কিছু ঘৃণ্যলোক রাতা-রাতি দালানের ইট-কাঠ পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছে। বহু গাছ-পালা সমূলে নির্মূল করলেও সব শেষ করতে সক্ষম হয়নি। এককালে যে সুরম্য প্রাসাদ এখানে প্রাণ স্পন্দনে স্পন্দিত হতো তা আজ  কেবলই অতীত। হাজার বছরের স্মৃতি বিজড়িত, কালের সাক্ষী জমিদার বাড়ী আজ ধ্বংসের মুখে। কারুকাজ মন্ডিত দেয়াল খসে পড়েছে, ভেঙ্গে গেছে দড়জা-জানালা,  জমিদার বাড়ী ঘেরা দালান ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবুও যা আছে তা অনেক, অঢেল। সেই অনেক অঢেলই আজ তৎকালীন দিনের জমিদারদের দাপটের নিরব সাক্ষী।
সে ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, জমিদার বাবু বহুগুনের অধিকারী ছিলেন। তিনি সুন্দর শাসক, মানবতাবাদী সর্বোপরি ন্যায় বিচারক, শিক্ষানুরাগী ও সাংস্কৃতিমনা ছিলেন । তিনি তার বিধবা সৎ মায়ের নামে ১৯০০ সালে  প্রায় বিশ একর জমির উপর শশীমুখী সেকেন্ডারি ইংলিশ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এখান থেকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হতো। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠায় দশজন দাতা সদস্যের তালিকায় তার নাম চার নম্বরে লিপিবদ্ধ আছে। হেমচন্দ্র চৌধুরি চট্রগ্রাম জেলার সীতাকুন্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলা উকিলবার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা রাখেন। গোপালপুর সূতী ভি এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি জমি ও অর্থ দান করেন। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা  হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় তার হিংস ভাগ অবদান রয়েছে। তখন কলকাতা থেকে শিল্পী এনে জেনারেটরে বাতি জ্বালিয়ে মঞ্চ নাটক, যাত্রা করা হতো হেমনগর গ্রামে। ভাষা সাহিত্যের চর্চাও হতো সেখানে। প্রতি রমজান মাসে রোজাদারদের ইফতার করানোর ব্যবস্থা থাকতো প্রতিদিন। এজন্য স্থাপন করা হয়ে ছিলো ডাক বাংলো। প্রজা সাধারণের সুবিধার্থে তিনি রাস্তার মোড়ে মোড়ে কূপ নির্মাণ এবং বহু সংখ্যক পুকুর খনন করেন। তিনি অত্যন্ত সৌখিন এবং সুন্দরের পুজারী ছিলেন। হেমনগরের প্রাকৃতিক নৈস্বর্গিক দৃশ্যের মধ্যে নির্মিত তার অপূর্ব কারুকাজময় বাসভবন আজও তার স্বাক্ষী বহন করে।
সমালোচকরা বলেন, এ গুলো করা হয়ে ছিলো নিজেদের প্রয়োজনে। এসব কীর্তিমান কাজের সঙ্গে কিছু  অপকীর্তির কাজও করেছেন তারা। জমিদার প্রাসাদ থেকে প্রজাদের হাতজোর করে মাথা নত হয়ে বের হতে হতো।  বাড়ীর পাশের রাস্তা দিয়ে জুতো পড়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে দিয়ে চলাচল করলে তাদের শাস্তি দেওয়া হতো। পল্লীর আর্ত্বমানবতার সেবায় তারা কিছুই করেনি। বরং রক্ত শূন্য শীর্ণ পল্লীর মানুষের হৃৎপিন্ডের শেষ রক্ত বিন্দু পযর্ন্ত তারা শোষণ করেছে। মাঝে মধ্যে কলকাতা থেকে নামি-দামি বাইজি আনতেন। এই অখ্যাত পল্লীর নিভৃত প্রাসাদের প্রকোষ্ঠে তারা নুপুরের নিক্কন তুলতেন। ফূর্তি চলতো সারা রাত। সেই ফূর্তির বন্যায় ভেসে যেতো হেমনগরের জমিদার বাড়ী। কিন্তু সাধারণ প্রজাবর্গের সেই সব বাইজি দেখার সৌভাগ্য হতো না। তবে জমিদার বাড়ীতে যারা হুকুম তামিল করতেন তারাই শুধু এক নজর দেখতে পেতেন। আজ সেই জমিদাররা কালের অতল গহব্বরে নিক্ষিপ্ত।
দেশ বিভাগের আগ মূহূর্তে কৃষক নেতা হাতেম আলী খানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। বারবার আপোষের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৬ সালে হেমবাবু জমিদারি গুটিয়ে স্থাবর অস্থাবর সম্পতি ফেলে কলিকাতা চলে যান।
কথিত আছে, হাতেম আলী খানের নেতৃত্বে গরু জবাই করে  জমিদার বাড়ীর পুকুরে গরুর ভুরি ভাসিযে দেওয়া হয়। এতে জমিদার মনোক্ষুন্ন হয়ে কলিকাতা চলে যান।
আরো কথিত আছে, যাওয়ার সময় তারা সাতটা ঘোড়ার গাড়ী ভরে টাকা নিয়ে যায়। পরে এ বাড়ীতে  জমিদারদের ডাক্তার বীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী থাকতেন। জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরি ১৯৫২ সালে ভারতের কাশিতে মৃত্যুবরণ করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫-৭৬ সালে স্থানীয় একশ’ ১১ জন কৃষক ‘শিমলাপাড়া ভূমিহীন কৃষক সমবায় সমিতি’ নামের একটি সংগঠন করে বাড়ীটির নিয়ন্ত্রন করে।
স্থানীয় মহল জমিদার বাড়ীটিকে কলেজের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করলে ১৯৭৯ সালে ‘হেমনগর খন্দকার আসাদুজ্জামান ডিগ্রী কলেজ’ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। ফলে বহু কালের পুরনো ইতিহাস নির্বিচারে ধ্বংসের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে। তবুও জমিদার বাড়ীর সৌন্দর্য আজ অতীত। জমিদার বাড়ীর ভাঙ্গা কক্ষে নানা রকমের অসামাজিক কার্যকলাপ চললেও এসব স্থাপত্য আমাদের  ইতিহাসের নিরব সাক্ষী ।
####
 

কিভাবে যাওয়া যায়:

গোপালপুর উপজেলা থেকে ১০ কি মিঃ দূরত্